বর্তমান ডিজিটাল বাংলাদেশে প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ কাজেই ট্যাক্সপেয়ার আইডেন্টিফিকেশন নম্বর বা ই-টিন (e-TIN) সার্টিফিকেটের প্রয়োজন হয়। ডোমেইন-হোস্টিং কেনা, ফেসবুক বা ইউটিউব থেকে ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ডলার আনা, ব্যবসা শুরু করা, সঞ্চয়পত্র কেনা কিংবা ব্যাংক লোনের জন্য ই-টিন এখন বাধ্যতামূলক। অনেকেই মনে করেন টিন সার্টিফিকেট তৈরি করা অনেক জটিল এবং এর জন্য কোনো কম্পিউটারের দোকানে বা আইনজীবীর কাছে যেতে হবে।
এই ধারণাটি সম্পূর্ণ ভুল। আপনার হাতে থাকা মোবাইল দিয়ে ই-টিন (e-TIN) সার্টিফিকেট তৈরি করে নিতে পারেন। আজকের এই আর্টিকেলে আমরা ধাপে ধাপে দেখবো কীভাবে মোবাইল দিয়ে ই-টিন (e-TIN) সার্টিফিকেট তৈরি করবেন।
ই-টিন (e-TIN) সার্টিফিকেট কী এবং কেন প্রয়োজন হয়?
সহজ কথায়, ই-টিন হলো ইলেকট্রনিক ট্যাক্সপেয়ার আইডেন্টিফিকেশন নম্বর। এটি ১২ ডিজিটের একটি নির্দিষ্ট নম্বর, যা জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) কর্তৃক একজন করদাতাকে দেওয়া হয়।
আপনার কেন এটি প্রয়োজন তা নিচে দেওয়া হলো:
- অনলাইন আয়ের টাকা ব্যাংকে আনতে: ফ্রিল্যান্সিং বা ব্লগিংয়ের মাধ্যমে অর্জিত ডলার যখন ব্যাংকে বৈধভাবে আনতে যাবেন, তখন ব্যাংক আপনার কাছে টিন নম্বর চাইতে পারে।
- ট্রেড লাইসেন্স ও ব্যবসা: যেকোনো নতুন ব্যবসা শুরু করতে বা ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন করতে টিন প্রয়োজন হয়।
- গাড়ি বা জমি কেনাবেচা: নির্দিষ্ট সীমার উপরে জমি বা ফ্ল্যাট কেনাবেচা এবং গাড়ি রেজিস্ট্রেশনের জন্য টিন প্রয়োজন হয়।
- ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও ক্রেডিট কার্ড: কারেন্ট অ্যাকাউন্ট খোলা বা ক্রেডিট কার্ডের লিমিট বাড়ানোর জন্য ব্যাংক এই টিন সার্টিফিকেট দাবি করে।
মোবাইল দিয়ে ই-টিন (e-TIN) সার্টিফিকেট তৈরি করতে কী কী লাগবে?
মোবাইল দিয়ে ই-টিন (e-TIN) সার্টিফিকেট তৈরি আবেদন করার আগে নিচের জিনিসগুলো আপনার কাছে রেডি রাখুন: ১. জাতীয় পরিচয়পত্র (NID Card): আপনার এনআইডি কার্ডের নম্বর এবং সঠিক জন্মতারিখ। ২. সক্রিয় মোবাইল নম্বর: একটি সচল মোবাইল নম্বর, যাতে ওটিপি (OTP) বা ভেরিফিকেশন কোড আসবে। ৩. ইন্টারনেট কানেকশন: আপনার মোবাইলে একটি ভালো ব্রাউজার (যেমন: Google Chrome) এবং ইন্টারনেট কানেকশন।
বিশেষ নোট: ই-টিন তৈরি করার জন্য আপনার কোনো ছবির প্রয়োজন নেই। আপনার এনআইডি কার্ডের ডাটাবেজ থেকে সরকারি সার্ভার স্বয়ংক্রিয়ভাবে আপনার ছবি ও স্বাক্ষর সংগ্রহ করে নেবে।
মোবাইল দিয়ে ই-টিন (e-TIN) সার্টিফিকেট তৈরি করার ধাপসমূহ
নিচের ধাপগুলো মনোযোগ দিয়ে লক্ষ্য করুন এবং আপনার মোবাইলে অ্যাপ্লাই করুন:
ধাপ ১: সরকারি ই-টিন ওয়েবসাইটে প্রবেশ করুন
প্রথমে আপনার মোবাইলের Google Chrome বা যেকোনো নিরাপদ ব্রাউজার ওপেন করুন। এবার সার্চ বারে লিখুন secure.incometax.gov.bd/TINHome অথবা সরাসরি NBR-এর অফিসিয়াল ই-টিন পোর্টালে প্রবেশ করুন। সাইটটি ওপেন হলে আপনি একটি মেনু দেখতে পাবেন। সেখান থেকে “Register” অপশনে ক্লিক করুন।
ধাপ ২: অ্যাকাউন্ট রেজিস্ট্রেশন (Registration)
এখানে আপনাকে একটি নতুন অ্যাকাউন্ট তৈরি করতে হবে। ফরমটি সঠিক ভাবে পূরণ করুন:
- User ID: আপনার পছন্দমতো একটি ইউনিক ইউজার আইডি দিন (যেমন: আপনার নামের সাথে কিছু সংখ্যা, যেমন
mahmud45)। এটি কোথাও লিখে রাখুন। - Password: কমপক্ষে ৮ অক্ষরের একটি স্ট্রং পাসওয়ার্ড দিন এবং ‘Confirm Password’-এ পুনরায় সেটি লিখুন।
- Security Question & Answer: একটি সিকিউরিটি প্রশ্ন সিলেক্ট করুন (যেমন: What is your pet’s name?) এবং নিচে তার উত্তর দিন। ভবিষ্যতে পাসওয়ার্ড ভুলে গেলে এটি লাগবে।
- Country: এটি ডিফল্টভাবে Bangladesh থাকবে।
- Mobile Number: আপনার সচল মোবাইল নম্বরটি দিন।
- Email Address: আপনার ব্যক্তিগত ইমেইল আইডিটি দিন (ঐচ্ছিক, তবে দেওয়া ভালো)।
- Captch Code: স্ক্রিনে যে আঁকাবাঁকা অক্ষরগুলো দেখছেন, হুবহু পাশের বক্সে তা টাইপ করুন।
সবশেষে নিচে থাকা “Register” বাটনে ক্লিক করুন।
ধাপ ৩: মোবাইল নম্বর ভেরিফিকেশন (OTP)
রেজিস্টার বাটনে ক্লিক করার সাথে সাথে আপনার দেওয়া মোবাইল নম্বরে একটি ৫ বা ৬ ডিজিটের গোপন অ্যাক্টিভেশন কোড (OTP) আসবে। সেই কোডটি স্ক্রিনের নির্দিষ্ট বক্সে বসিয়ে “Activate” বাটনে ক্লিক করুন। আপনার অ্যাকাউন্ট সফলভাবে তৈরি হয়ে যাবে।
ধাপ ৪: লগইন এবং টিন অ্যাপ্লিকেশান (Login & Application)
অ্যাকাউন্ট অ্যাক্টিভেট হওয়ার পর আপনার তৈরি করা ইউজার আইডি এবং পাসওয়ার্ড দিয়ে সাইটটিতে Login করুন। লগইন করার পর স্ক্রিনে “TIN Application” বা “Click Here” নামে একটি লিঙ্ক দেখতে পাবেন, সেখানে ক্লিক করুন।
ধাপ ৫: করদাতার বিবরণ পূরণ (Taxpayer Details)
মোবাইল দিয়ে ই-টিন (e-TIN) সার্টিফিকেট তৈরি করতে এখানে আপনাকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সিলেক্ট করতে হবে:
- Assessment Organization: এটি “Individual” (ব্যক্তিগত) সিলেক্ট করুন।
- Type of Taxpayer: আপনার এনআইডি অনুযায়ী এটি “Individual Bangladeshi” সিলেক্ট করুন।
- Main Source of Income: আপনার আয়ের মূল উৎস কী তা সিলেক্ট করুন (যেমন: Service/Business/Profession)। আপনি যদি ফ্রিল্যান্সার বা ব্লগার হন, তবে ‘Profession’ বা ‘Other’ দিতে পারেন।
- Location of Main Source of Income: আপনি যে জেলা বা এলাকায় থাকেন বা ব্যবসা করেন, সেই জেলার নাম সিলেক্ট করুন।
সব ঠিক থাকলে “Go to Next” বাটনে ক্লিক করুন।
ধাপ ৬: এনআইডি কার্ড অনুযায়ী ব্যক্তিগত তথ্য প্রদান
এই ধাপে কোনো ভুল করা যাবে না। আপনার এনআইডি কার্ডে যেভাবে আছে, হুবহু সেভাবে তথ্যগুলো ইংরেজিতে লিখুন:
- Taxpayer’s Name: এখানে আপনার নাম দিবেন।
- Gender: পুরুষ হলে Male, নারী হলে Female।
- National ID Number: আপনার এনআইডি কার্ডের ১০ বা ১৭ ডিজিটের নম্বরটি দিন।
- Date of Birth: ক্যালেন্ডার থেকে আপনার সঠিক জন্মতারিখ’টি সিলেক্ট করুন।
- Father’s & Mother’s Name: পিতা ও মাতার নাম লিখুন।
- Spouse Name: বিবাহিত হলে স্বামী বা স্ত্রীর নাম দিতে পারেন (বাধ্যতামূলক নয়)।
- Current & Permanent Address: আপনার বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা জেলা, থানা ও পোস্ট কোডসহ সঠিকভাবে পূরণ করুন।
সব তথ্য দেওয়া হয়ে গেলে পুনরায় চেক করে “Go to Next” বাটনে ক্লিক করুন।
ধাপ ৭: তথ্য যাচাই ও সাবমিট (Final View)
মোবাইল দিয়ে ই-টিন (e-TIN) সার্টিফিকেট তৈরি করার এই ধাপে আপনার পূরণ করা সব তথ্য একসাথে স্ক্রিনে দেখানো হবে। খুব ভালো করে মিলিয়ে দেখুন এনআইডি নম্বরের সাথে নামের বানান এবং জন্মতারিখ ঠিক আছে কি না। যদি সব ঠিক থাকে, তবে নিচে থাকা টিক বক্সে (Submit Application) ক্লিক করে চূড়ান্তভাবে সাবমিট করুন।
ধাপ ৮: ই-টিন সার্টিফিকেট ডাউনলোড ও প্রিন্ট
আবেদনটি সাবমিট করার সাথে সাথেই সরকারি ডাটাবেজ আপনার এনআইডি যাচাই করে স্ক্রিনে আপনার ছবিসহ ই-টিন সার্টিফিকেটটি প্রদর্শন করবে।
- নিচে “View Certificate” অপশন পাবেন।
- সেখানে ক্লিক করলে সার্টিফিকেটের নিচে “Save Certificate” বা “Print” অপশন আসবে।
- আপনি পিডিএফ (PDF) ফাইল হিসেবে এটি আপনার মোবাইলে ডাউনলোড করে রেখে দিন। পরবর্তীতে যেকোনো কম্পিউটারের দোকান থেকে এটি এ-ফোর (A4) সাইজের কাগজে প্রিন্ট করে নিতে পারবেন।
কিছু জরুরি সতর্কতা ও সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. ই-টিন সার্টিফিকেট থাকলে কি প্রতি বছর ট্যাক্স বা কর দিতে হবে?
- উত্তর: না, টিন সার্টিফিকেট থাকলেই কর দিতে হয় না। তবে প্রতি বছর সরকারি নিয়ম অনুযায়ী আপনার আয় যদি করযোগ্য সীমার নিচেও হয়, তাও একটি “শূণ্য রিটার্ন” (Zero Return) জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক। বর্তমানে রিটার্ন জমা না দিলে জরিমানার বিধান রয়েছে।
২. মোবাইল দিয়ে ই-টিন (e-TIN) সার্টিফিকেট তৈরি করা সার্টিফিকেট টি কি সব জায়গায় গ্রহণযোগ্য?
- উত্তর: হ্যাঁ, মোবাইল দিয়ে ই-টিন (e-TIN) সার্টিফিকেট তৈরি করলেও সম্পূর্ণ ডিজিটাল এবং বারকোডযুক্ত অফিসিয়াল সার্টিফিকেট পাওয়া যায়। কম্পিউটারের দোকান বা মোবাইল—যেখান থেকেই করুন না কেন, এর মান ও গ্রহণযোগ্যতা সমান।
৩. একটি এনআইডি দিয়ে কয়টি টিন সার্টিফিকেট করা যায়?
- উত্তর: একটি এনআইডি কার্ড দিয়ে আজীবনে মাত্র ১টি ই-টিন সার্টিফিকেটই তৈরি করা সম্ভব। তাই তথ্য দেওয়ার সময় সর্বোচ্চ সতর্ক থাকুন।
উপসংহার
ডিজিটাল যুগে এসে সামান্য একটি সার্টিফিকেটের জন্য দালালের পেছনে টাকা খরচ করার কোনো মানে হয় না। মোবাইল দিয়ে ই-টিন (e-TIN) সার্টিফিকেট তৈরি করার এই নিয়মটি যেমন সহজ, তেমনই নিরাপদ। আশা করি এই গাইডের মাধ্যমে আপনি নিজেই আপনার মোবাইল দিয়ে ই-টিন (e-TIN) সার্টিফিকেট তৈরি করে নিতে পেরেছেন। আপনার যদি আবেদন করতে গিয়ে কোনো ধাপে সমস্যা হয়, তবে নিচে কমেন্ট করে আমাদের জানাতে পারেন।
জমির মৌজা ম্যাপ অনলাইনে দেখুন এবং ম্যাপ ডাউনলোড ও আবেদন করুন